আমার হাজ্জ্ব

আমার হাজ্জ্ব

আমার হাজ্জ্ব

By In undefined On 4/7/2020

 হাজ্জ্ব আসার আগ থেকে আমার মধ্যে একধরণের অস্থিরতা শুরু হয়। মনে পড়ে ছোটবেলার কথা। বড়রা সেজেগুজে কোথাও যাচ্ছে, আমাকে নিবেনা। আমিও বুঝতে পারছি যে আমার ওখানে যাওয়া সম্ভব নয়। তখন কষ্টে কেমন জানি ধুপুস করে শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করে “হে আমার রব, আমাকে আবার নিও”-এই বলে।


হাজ্জ্ব নিয়ে মানুষের উদাসীনতা দেখলে অবাক লাগেনা। কারণ এই ব্যাপারটায় কেউ উৎসাহিত করেনা। মানুষ ভাবে, হাজ্জ্ব অনেক কষ্টের। আগে তাই ছিল। কিন্তু এখন প্রচুর সুযোগসুবিধা। অনেকেই আমাকে বিভিন্ন সমস্যা বলেছেন হাজ্জ্বের ব্যাপারে। কিন্তু এগুলো আসলে অজুহাত ছাড়া কিছুই না। শয়তান নানাভাবে ওয়াসওয়াসা দেয়।

চোখ বন্ধ করলেই আমি যেন এখনও হারামশরীফের মিষ্টি গন্ধটা পাচ্ছি. . . .

পরম করুণাময় আল্লাহর নামে শুরু করছি

আমার বর বিয়ের আগেই আমায় কথায় কথায় একবার বলেছিল, “বিয়ের পর তোমাকে নিয়ে হাজ্জ্ব করব।” আমি শুনে তো অবাক,বলে কি রে এ লোকটা! কোথায় বলবে দার্জিলিং যাবে, ব্যাংকক যাবে, তা না, হাজ্জ্ব করবে।এত তাড়াতাড়ি কিসের হাজ্জ্ব!প্রথমে ভাল না লাগলেও উনার এই চিন্তাধারা যে কতবড় পাওয়া আমার জন্য,তা আজ বুঝি।

বিয়ের আড়াই বছর পার হল। ছেলের বয়স তখন তেরমাস। তিনি হাজ্জ্বে যেতে চাইলেন। যদিও আমাকে নিয়ে হাজ্জ্ব করার পরিকল্পনা ছিল কিন্তু সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে তিনি আমাকে হাজ্জ্বে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করলেন না। না করার যথেষ্ট কারণ ছিল।আমার ছেলেটা খুব শুকনা আর বুকের দুধ ছাড়া কিছুই খেতনা। তাছাড়া ও কারও কাছেই যেতনা। যেহেতু সে কারও কাছেই থাকেনা এমতাবস্থায় দুধের বাচ্চাকে রেখে যেতে তিনি ঠিক ভরসা পাচ্ছিলেন না। কিন্ত আমি যেতে চাইলাম। আমার কেবল একটা কথাই মনে হচ্ছিল,একবার তিনি হাজ্জ্ব করে ফেললে আমাকে নিয়ে যাবার আগ্রহ আর থাকবেনা।আমি তাকে নানাভাবে রাজি করাতে লাগলাম।‘অর্কর তো দেড় বছর হয়ে গেছে।ওকে এখন থেকেই গরুর দুধ অভ্যাস করলে যাওয়ার সময় সমস্যা হবেনা।’ এই ছিল আমার যুক্তি।তিনি অবশ্য ছেলেকেও নিয়ে যেতে চাইছিলেন। কিন্তু আমি চাচ্ছিলাম না। একটা বাচ্চার পেছনে অনেকসময় চলে যায়। আর ও তো কারও কাছেই থাকবেনা। তাহলে আমি ইবাদাত করব কখন! নানা লোকের পরামর্শ নিলাম। যারা হাজ্জ্ব করেছেন,তারা বাচ্চাকে না নেয়ার কথাই বললেন। আমার আত্মীয়স্বজনেরও খুব একটা ইচ্ছা নেই। তুই এত ছোটমানুষ,তুই কি হাজ্জ্ব ধরে রাখতে পারবি?(যেন হাজ্জ্ব করলেই নামাজ,পর্দা বাধ্যতামূলক,এর আগে না। আরহাজ্ব ধরে রাখা কি জিনিস আমার কাছে বোধগম্য নয়)আমি সেসময় সবেমাত্র পাঁচওয়াক্ত সালাত আদায় করা শুরু করেছি,মাথায় কাপড় দেই,আবার দেইনা। আমি হাজ্জ্বের জন্য লাফালাফি করছি,এটা আসলে ওরা গুরুত্ব দিচ্ছিল না।

হাজ্জ্বের জন্য শপিং করলাম। এখানে একটা জিনিস বলে রাখা ভাল। এজেন্সী থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের যে লিস্ট দেয় তার কিছুই টেনে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন পড়েনা। হাতমোজা,পা মোজা, মেসওয়াক এগুলো ওখানে মসজিদের বাইরে প্রচুর বিক্রি হয়। আর দামেও সস্তা। যে জিনিসটা সবচেয়ে প্রয়োজনীয় কিন্তু লিস্ট এ নেই তা হল ছাতা আর সানগ্লাস। এত কড়া রোদ যে খালি চোখে তাকানো খুব কষ্টকর। আর ওদেশে বোরকাটাই আরামদায়ক। নেকাব পড়লে আরও আরাম। ঘাম হয়না। আর গরমও লাগেনা। বরং যেসব জায়গা উন্মুক্ত থাকে মনে হয় আগুনের হলকা এসে লাগছে। গাউসিয়া নিউমার্কেটে হাজ্জ্বের কাপড় বলে সাদা প্রিন্টের বাজে সুতার কাপড় বিক্রি করে। এমনভাবে ওরা বলবে যেন এটাই হাজ্জ্বের ইউনিফর্ম! আমিতো ছয়সেট বানিয়েছিলাম। সবই ছিড়ে গেছে। আর বায়তুল মোকাররমেও হাজ্জ্বের আগ দিয়ে হাবিজাবি জিনিস বিক্রি করে। এই যেমন পাথর মারার ব্যাগ, টাকা রাখার ব্যাগ। এগুলোর কোনই প্রয়োজন নেই। যেকোন পুরনো ব্যাগেই এসব করা যায়। আমি এগুলো সবই কিনেছিলাম। সবাই কেনে। প্রথমবার গিয়ে এধরনের ভুল করে সবাই।

আত্মীয়স্বজন সবার কাছে ক্ষমা চাইলাম। হাজ্জ্বের মাসলা-মাসায়েল সম্পর্কিত বই পড়লাম ।

যাওয়ার দিন অনেকেই দেখা করল। অর্ক আপনমনে খেলে যাচ্ছে। আমি তৈরি হচ্ছি। লাগেজে অর্ক তার কাপড়ও রাখছে। দেখে বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল। ওর বাবা কাঁদছে। অথচ আমার কোন কষ্টই হচ্ছেনা। আমার এইটুকুন বাবুটাকে রেখে যাচ্ছি, তাওনা। অথচ লিখতে গিয়ে এখন আমার হাত কাঁপছে! কি করে পেরেছিলাম এত পাষাণ হতে! আল্লাহরই ইশারায় হয়ত। কষ্ট হলে তো যেতে পারতাম না।

সেদিনও অর্ক আমার হাতেই খেয়েছিল। আমার এত কাজের মাঝেও ও কিছুতেই ওর নানুর হাতে খাবেনা। সবাই এ দৃশ্য দেখে কষ্ট পাচ্ছিল। আম্মু তো ভয় পাচ্ছিল আমি আবার না বেঁকে বসি। কিন্তু বললাম, ওই যে, পাষাণ হৃদয়! আমার এখন যেমন কষ্ট হচ্ছে, তখন এসবের কিছুই হচ্ছিলনা।

আমরা বাসা থেকে বের হই রাত নয়টায়। অর্ককে ঘুমের মাঝে রেখে বিমানবন্দরের দিকে রওয়ানা হলাম।

হাজী ক্যাম্পে পৌঁছালাম। আগেই ইহরাম বেঁধে এসেছি। অনেকে সেখানেও বাঁধছেন। ফজরের আযান দিল। আমরা সেখানে ফজর সালাত আদায় করলাম। কাফেলা লিডারবারবার বলছিলেন এয়ারপোর্টে যেয়ে সালাত আদায় করতে। তার কথা যে শোনা উচিতছিল, এয়ারপোর্টে গিয়ে বুঝতে পেরেছিলাম। কারণ হাজ্জ্ব ক্যাম্পের বাথরুম খুব নোংরা ছিল। আর এয়ারপোর্টে হাজীদের জন্য তৃতীয় তলায় খুব সুন্দর ব্যবস্থা ছিল। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন বিশাল নামাজের জায়গা, বেশ কয়েকটা পরিচ্ছন্ন বাথরুম, আলাদা ওজুর স্থান। চা,কফি, পানির ব্যবস্থা।

যাহোক, সালাত শেষে এয়ারপোর্টে যাওয়ার জন্য বাসে উঠলাম। বাসা থেকেই তালবিয়া পাঠ করতে করতে এখানে এসেছিলাম, কিন্তু বাসে যখন সকলে সমস্বরে লাব্বাইক ধ্বণিতে একাকার হয়ে গেলেন-সেটা কেমন অনুভূতি, তা লিখে প্রকাশ করার মত যোগ্যতা আমার নেই। গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গিয়েছিল! মা আমি, মেয়ে আমি, বোন আমি, স্ত্রী আমি, এই পৃথিবীর সকল আমি সত্তা একাকার হয়ে মিশে গিয়েছিল ওই তালবিয়ায়! আমার শরীর স্থির, আত্মা প্রচন্ড অস্থির; আমি, তুচ্ছ, ক্ষুদ্র কিন্তু অসম্ভব সৌভাগ্যবতী মেয়েটা যাচ্ছি, আল্লাহর মেহমান হয়ে! পুরো বাসে পুরুষেরা জোরে জোরে, মেয়েরা আস্তে আস্তে তালবিয়া পাঠ করছে। রাস্তার লোকেরা সালাম দিচ্ছে- আমার চোখ থেকে টপ টপ করে পানি পড়ছে এই  লেখা লিখতে গিয়ে. . .আবারও বলছি, সেই অনুভূতি বোঝানোর সাধ্য আমার নেই।শুধু আল্লাহর কাছে প্রার্থণা, লেখাটি যারা পড়ছেন, সেই সহ সবাইকে যেন আল্লাহ তালবিয়া পাঠের অনুভূতি বোঝার সুযোগ করে দেন! আমিন।

”লাব্বাঈক আল্লাহুম্মা লাব্বাঈক, লাব্বাঈক, লা-শারীকা-লাকা লাব্বাঈক, ইন্নাল হামদা ওয়ান্ নি’মাতা লাকা ওয়াল-মুল্ক, লা শারীকালাক।”

অর্থ: আমি হাজির হে আল্লাহ! আমি উপস্থিত!আপনার ডাকে সাড়া দিতে আমি হাজির!আপনার কোন অংশীদার নেই। নিঃসন্দেহে সমস্ত প্রশংসা ও সম্পদরাজি আপনার এবং একচ্ছত্র আধিপত্য আপনার। আপনার কোন অংশীদার নেই।

আবার তালবিয়া পাঠ, দীর্ঘ পথ ভ্রমণ।মাঝে মাঝে নেমে ফ্রেশ হয়ে নেয়া।মক্কায় প্রবেশের যে কুরআনের ম্যুরাল চিহ্নিত রাস্তা, সেটা দেখে উত্তেজনা আরও বেড়ে গেল।উচ্চস্বরে তালবিয়া পাঠ করতে করতে আমরা মিসফালাহে পৌঁছালাম।এখানেই আমাদের হোটেল ছিল।বর্তমানে নেই।কারণ হারামশরীফ সম্প্রসারনের জন্য এস্থান ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে।হোটেলটা খুব কাছে ছিল।



হোটেলে পৌঁছানোর পর রুমে ঢুকতে মন চাইছিল না।এত কাছে আল্লাহর ঘর! কখন যাব!! কিন্তু সবাই যেহেতু ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত।তাই আমীর বললেন, ফ্রেশ হওয়ারপর রাতে নিয়ে যাবেন।

ঘরে ঢুকলাম। ছোট্ট একটা ঘর। এই প্রথম আমার অর্কর কথা মনে হল। কি স্বার্থপর মা আমি!পুরো একটা দিন ওকে ভুলে ছিলাম!আমার ঘরের ভেতর দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগল।হৃদপিন্ডটা মনে হচ্ছিল ঘরের দেয়ালে ক্ষণে ক্ষণে প্রচন্ড জোরে বাড়ি খেয়ে থেঁতলে যাচ্ছে। আম্মুকে ফোন দিলাম। জানলাম ও রাতে দুধের পিপাসায় জেগে উঠেছিল, ওর চাচা সারারাত পায়ে নিয়ে বসেছিল। দিনে সমস্যা হয়নি।খোঁজে, কিন্তু কান্নাকাটি করেনা।খেলছে।এভাবে পুরো একটা মাস ওর চাচা সারারাত ওকে পায়ে নিয়ে থেকেছে,তারপর দিনে অফিস করেছে!আল্লাহ তাকে উত্তম প্রতিদান দিন।প্রত্যেকে, এমনকি পাশের ফ্ল্যাটের লোকেরাও ওর জন্য অনেক করেছেন। আমার বর ও আমার বন্ধুরাও আমাদের অনুপস্থিতিতে এসে ওর সাথে সময় কাটিয়েছেন। আল্লাহ সবকিছু সহজ ও সুন্দর করে দিয়েছিলেন। সুবহানাল্লাহ!

আমার বর আর আমি দুজনেই থমথমে মুখে বসে আছি।এরপর হারাম শরীফের দিকে গেলাম।

এত সুন্দর!এত! বাতাসে কেমন মিষ্টি ঘ্রাণ! ভেপোরাইজার দিয়ে বাস্প ছড়ানো হচ্ছে।মুখে এসে বিন্দু বিন্দু ছুঁইয়ে দিচ্ছে-মনে হচ্ছিল ছোটবেলার রুপকথার বইয়ের ছবিগুলোতে যেমন কেমন একটা স্বপনের আবেশ জড়িয়ে থাকত,ঠিক তেমন!ছোটবেলায় সে গল্পের বইয়ের ছবিগুলোর মাঝে চুপিচুপি ঢুকে সিন্ডারেলাকেসামনাসামনি দেখতে খুব ইচ্ছে হত।আমার এখন মনে হচ্ছিল আমি যেন আসলেই টুপ করে স্বপ্নের মাঝে ঢুকে পড়েছি।স্বপ্ন না তো কি, স্বপ্নই তো! স্বপ্নও তো এত সুন্দর করে দেখিনি!

তখনও ভেতরে যাইনি।বাইরের নকশা দেখেই দিশেহারা!কখন সেই কাঙ্খিত কাবাঘরটা দেখব!যার প্রথম দেখাতেই আমার দু’আ কবুল হবে,শুধু চেয়ে থাকলেও নেকী বরাদ্দ! কখন যে ছেলের জন্য কষ্ট আল্লাহ ভুলিয়ে দিলেন, টেরও পেলাম না।

কাবার দিকে যাওয়ার আগেই ইশার আযান দিয়ে দিল।

কাবার দিকে যাচ্ছি।কাবাকে দেখেই আমার তালবিয়া পড়া শেষ হবে।লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক।আমি হাজির,ইয়া আল্লাহ আমি হাজির!সারা শরীর ঝিমঝিম করছে।আমি খালি পায়ে এক পা এক পা করে এগিয়ে যাচ্ছি-আমি হাজির, হে প্রভু, আমি হাজির!কেমন মোহাবিষ্ট হয়ে আছি, মনে মনে কত রিহার্সেল দিয়েছি!কাবাকে দেখে বিনা হিসেবে জান্নাত চাইব!চেয়েছিলাম হয়ত, স্পষ্ট করে বলতে পারব না।কেমন সম্মোহিত ছিলাম। মেয়ে গার্ড আমার ব্যাগ চেক করেছিল।এরপর সামনে এগিয়ে গেলাম। কাবা!

কাবা!আমি কাবার সামনে দাঁড়িয়ে!মসৃন মার্বেলের টাইলসে দাঁড়িয়ে কাল গিলাফ দেয়া পৃথিবীর ঠিক কেন্দ্রে সুউচ্চ কাবাকে দেখছি আমি!

তাওয়াফ করব।সবুজ বাতি বরাবর পা রেখে কাবার দিকে মুখ করে তাকিয়ে দু’আ পড়ে ইশারায় হাজরে আসওয়াদকে স্পর্শ করে হাতের তালুতে চুমু খেয়ে ডান দিকে ঘুরে তাওয়াফ শুরু করলাম।কাবার দিকে মুখ দেয়া যাবেনা।শুধু এক চক্কর শেষে সবুজ বাতি বরাবর ইশারায় হাজরে আসওয়াদকে চুমু খেয়ে আরেক চক্কর, এভাবে সাতচক্কর শেষ করলাম।দূর থেকে যতটা ভিড় মনে হয়েছিল তাওয়াফ করতে গিয়ে তেমন ধাক্কাধাক্কি হয়নি।

তাওয়াফ শেষে পেট ভরে জমজমের পানি খেলাম।নিমেষেই সব পিপাসা, ক্লান্তি শেষ!আল্লাহর এক অলৌকিক নিয়ামত এ পানি।বইতে পড়েছিলাম, এক হাজী চল্লিশ দিন শুধু জমজমের পানি খেয়ে কাটিয়েছেন।তার ক্ষুধা, তৃষ্ণার জন্য জমজমের পানিই যথেষ্ট ছিল।বৈজ্ঞানিকভাবেও এর যথার্থতা প্রমানিত।আগে অল্প খাওয়ার সৌভাগ্য ছিল।কিন্তু হাজ্জ্বের এই পঁয়ত্রিশদিন প্রাণভরে যমযমের পানিই খেয়েছি,অন্য পানি খাইনি!

তাওয়াফ শেষে সাঈ’ করার পালা।আমি তো জানি সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে সাঈ করতে হবে,বইতে সেরকমই লেখা আছে।একটু চিন্তাও হচ্ছে, এত লোক, ধাক্কাধাক্কিতে না আবার পড়ে যাই! ওমা পাহাড় এটা!টাইলস দেয়া! প্রশ্বস্ত রাস্তার মত।সাফাপাহাড়ের কিছু অংশ রেখে দেয়া হয়েছে কাচের ঘেরা অংশে।আর মারওয়া পাহাড়ের কিছু অংশে পা দেয়ার সুযোগ আছে, কিন্তু এখানটায় কিছু একটা করা আছে, কেমন পিচ্ছিল! যেখানে খাবার,পানি,লোকালয় কিছুই ছিলনা, শিশু ইসমাঈল (আ) ক্ষুধা তৃষ্ণায় কাঁদছিলেন আর মা হাজেরা অস্থির হয়ে একবার সাফা, একবার মারওয়া পাহাড়ে ছোটাছুটি করছিলেন,আজ সেখানে কত আধুনিকতা!

আমিও ছেলে রেখে এসেছি।তাই অর্কর মুখটা মনে করে মা হাজেরার অস্থিরতা অনুভব করার চেষ্টা করছিলাম।তাওয়াফ এবং সাঈ এ পড়ার জন্য কিছু সুন্দর দু’আ আছে।আমি এগুলো শিখিনি।ইচ্ছে করেই।মুখস্ত দু’আয় কেমন ইমোশনটা হারিয়ে যায়।তাই বলে আমি আবার কাউকে দু’আ শেখায় অনুৎসাহিত করছিনা কিন্তু!

এরপর চুল কেটে এহরাম মুক্ত হলাম।উমরাহ সমাপ্ত হল।

প্রথমদিন হারামশরীফ ছিল আমার জন্য মুগ্ধ বিস্ময়কর এক জায়গা। হা হয়ে দেখেছিলাম একে। পরেরদিন এটা হয়ে গেল আমার জায়গা। নিজের ঘরে যেমন আপন আপন লাগে, ঠিক তেমনি।

হারামশরীফে সবচেয়ে বেশি সওয়াব হল কাবাঘর তাওয়াফে।আর এই তাওয়াফ জীবিত,মৃত যে কারও নামে করা যায়। শুধু তাকিয়ে থাকলেও সওয়াব হয়। আমরা দুজনে একটা কাজ করতাম। তাহল, ইশার নামাজের পর খেয়েদেয়ে চা খেয়ে হারামশরীফে চলে যেতাম। সারারাত ওখানে থাকতাম। সারারাত তাওয়াফ আর কুরআন তিলাওয়াত করতাম। কুরআন খতম দিয়েছিলাম আলহামদুলিল্লাহ। একবারে ফজর পড়ে বাসায় ফিরতাম।

প্রথমে আমরা ভেবেছিলাম রাতে তাওয়াফে বুঝি ভিড় কম হবে। সেজন্যই এই পরিকল্পনা। কিন্তু সবদেশে তো আর এক সময়ে রাত হয়না। রাতে বরং ভিড় বেশি। তবে হারাম শরীফ ফাকা থাকে।রাতে তাওয়াফের ফাকে যখন কুরআন তিলাওয়াত করতাম, মাঝে মাঝে কাবার দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে যেতাম। একটু পরপর এক এক কাফেলা এসে তাওয়াফে ঢুকছে আর তাওয়াফের সার্কেলটা বড় হয়ে যাচ্ছে। আল্লাহু আকবার! ঘন্টায় ঘন্টায় মক্কায় হাজীদের বাস আসছে, আর তাওয়াফে ভিড় বাড়ছে। কেমন ঈদ ঈদ ভাব। মক্কা ঘুমায় না। এক মুহূর্তের জন্য তাওয়াফ থেমে নেই, থামবেনা কিয়ামতের আগ পর্যন্ত।
ইবরাহীম (আ) ছেলে ইসমাঈল (আ)কে নিয়ে কাবাঘর পুনঃনির্মান করেন। তিনি যে পাথরে দাঁড়িয়ে এ কাজ করতেন তাকে মাকামে ইবরাহিম বলে। এটা কাচ দিয়ে ঘেরা। এর পেছনে দাঁড়িয়ে দু’রাকাআত সালাত আদায় করেছিলেন আমাদের রাসূল পাক (স)। আমি প্রথমদিকে করেছিলাম। পরে ভিড়ের কারণে করা হয়নি।

কাবার সামনে যে গোল করে ঘের দেয়া আছে, তাকে হাতিম বলে। এটা কাবারই অংশ। মহানবী (স) একবার তাঁর সহধর্মিনী আয়েশা (র)কে বলেন, “এখানে নামায পড়।কেননা এটা কাবারই অংশ।”কুরাইশগণ কাবা যখন মেরামত করে তখন এর মেরামতির কাজে তারা শুধু হালাল অর্থ ব্যয় করেছিল।টাকার স্বল্পতার কারণে অতটুকু জায়গায় তারা কাবার দেয়াল তুলতে পারেনি।তাই গোল করে চিহ্নিত করে অতটুকু বাদ রেখে তারা মেরামত সমাপ্ত করে।তবুও সততার ব্যাপারে আপোষ করেনি।সেকালের মূর্তিপূজকরাও সততার ব্যাপারে আমাদের থেকে এগিয়ে ছিল। এ জায়গায় দু রাকাআত  নামাজ পড়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল।শুধু হাজরে আসওয়াদকেই চুমু খাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি.

আমার হাজ্জ্ব – সোনার মদীনায়

ইস্তিগফার পাঠ করতে লাগলাম যতক্ষন না আমাদের ওই স্থান ছেড়ে যাচ্ছি। যে রাস্তায় এতদিন হেঁটেছি, সেই একই পথে আমাদের রাসূলুল্লাহ (স) ও কত নবী সাহাবাদের পা পড়েছে সুবহানাল্লাহ!এই পবিত্র জায়গার আদব ঠিকমত পালন করতে পারলাম কিনা তাই ইস্তিগফার পাঠ।এই পবিত্র ভূমিতে দর্পভরে চলেছি, যে পাপ করেছি আল্লাহ যেন ক্ষমা করেন।

দরুদ পাঠ করতে করতে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে অবশেষে মদীনায় এলাম।এত সুন্দর!খুব পরিকল্পিত সব কিছু।একটা নির্দিষ্ট সংখ্যক হাজী আসবেন, তাদের সফর শেষ হলে অন্য হাজীরা আসবেন। তাই মদীনায় মক্কার মত ভিড় নেই।

এখানের অভিজ্ঞতা আমার জন্য বিশেষ কিছু। কারণ এখানে আমি বরের সাথে ছিলাম না। তিনজন দ্বীনিবোনের সাথে ছিলাম। এত মজা হত যে বলার মত না। দ্বীনি বোনদের জায়গাটা আর কেউ নিতে পারেনা।

আবহাওয়া প্রচন্ড শুষ্ক।আধাঘন্টায়ই কাপড় শুকিয়ে যায়। সে বছর হাজ্জ্ব সুন্দর সময়ে হয়েছিল আলহামদুলিল্লাহ। না শীত, না বৃষ্টি।

মসজিদে নববী!যে মসজিদে এক ওয়াক্ত সালাত আদায়ের ফজিলত মসজিদে হারাম ব্যতীত অন্য মসজিদের এক হাজার সালাত অপেক্ষা উত্তম।হযরত আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, হুজুর (সাঃ) থেকে বলেন, “যে আমার মসজিদে ধারাবাহিক ভাবে ৪০ ওয়াক্তনামাজ আদায় করবে,সে জাহান্নামের আযাব এবং নেফাক থেকে মুক্তি পাবে।”

আমরা পৌঁছতে রাত হয়ে গেল।রাতে আর যাওয়া হলনা।বাইরে থেকে শুধু দেখছিলাম অনেকগুলো স্তম্ভ।ঠিক যেন গোলাপের কলি।পরে ফজরের সালাত আদায় করে সকাল সাতটায় দেখি কলিগুলো ছাতার মত মেলে গেল। ঠিক যেন গোলাপ ফুটল!

মাথার ওপর থেকে ছাদ সরে যাওয়া-খুব অবাক হলে বা নিরাশ্রয় হলে কথাটা প্রায়ই শুনি আমরা।মসজিদে নববী তে কিন্তু আসলেই মাথার ওপর থেকে ছাদ সরে যায়! দুপুরে রোদ হেলে পড়লে ভিতরের নামাজের স্থানের ছাদটা আস্তে আস্তে সরে যায়।আর এসির ব্যবস্থা এর পিলারে। মসজিদের পিলারের কাছাকাছি বসলে ঠান্ডা হাওয়া আসে।

খেজুর পাতার ছাউনি দিয়ে আমাদের রাসূল (স) যে মসজিদ নির্মান করেছিলেন, তার আজ কত উৎকর্ষ!

যমযমের পানি মিস করছিলাম। দেখি মসজিদে নববীতেও যমযমের পানির ব্যবস্থা। এই ব্যাপারটা আমাকে অবাক করেছে। মক্কা ও মদীনার দূরত্ব অনেক। এখানে তাদের নিশ্চয়ই কোন টেকনিক্যাল সাপোর্ট আছে।আমাদের কাফেলার এক দম্পতি জানিয়েছিলেন, মসজিদে নববী থেকে বেশ খানিকটা দূরে এর টেকনিক্যাল দিকগুলো নিয়ন্ত্রন করা হয় যার রাস্তাও আলাদা।কারণ হল ভিন্যধর্মী ইঞ্জিনিয়ার ও 
টেকনিশিয়ান।(সারা পৃথিবীতে খুঁজে মুসলিম টেকনিশিয়ান পাওয়া গেল না যারা একটা মসজিদের জন্য যথেষ্ট! ভিনধর্মী এনে বিপুল ব্যয়ে আরেকটা রাস্তা বানিয়ে দূর থেকে এই কাজ করতে হল!)

যাহোক,মসজিদে নববীতে পুরুষ ও মহিলার স্থান একেবারেই আলাদা।নামাজের স্থান, ওজুর স্থান, ফ্রেশরুম সব।মেয়েদের জায়গায় ভলান্টিয়ার, ক্লিনার সবাই মেয়ে।নবীজীর রওজা দেখার সময়ও আলাদা নির্দিষ্ট করা।

তাই এবার আর রওজায় আমাদের আমীর নিয়ে যেতে পারবেন না।আমাদেরই খুঁজে নিতে হবে।

নবীজীর রওজা দেখব বলে বসে আছি।নামাজের পর ভলান্টিয়াররা এক এক গ্রুপ করে দেখায়।বিভিন্ন দেশের নাম সম্বলিত প্লাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে থাকে ভলান্টিয়াররা। আমরা বাংলাদেশের গ্রুপে বসে রইলাম।একটু পর পর এক একটা দরজা খুলছে আর আমরা সেটাতে প্রবেশ করছি।এভাবে ধাপে ধাপে এগিয়ে একপর্যায়ে আমরা রওজার সামনে অপেক্ষা করছি আর দু’আ দরুদ পড়ছি।

অনেক দূর থেকে এসেছি তাঁর রওজা দেখব বলে।যত কাছাকাছি হচ্ছি, উত্তেজনায় চোখে পানি চলে আসছে!কাবাকে দেখার সময়ও এমনটি হয়েছিল।যত কাছে আসি তত কান্না পায়, আনন্দে কেমন দিশেহারা লাগে।

রওজায় প্রবেশ করলাম অবশেষে।কিছু দেখাই যাচ্ছিল না।দরজা, তার সামনে আবার বই রাখা। আমাদের কাফেলার এক দ্বীনি বোন চল্লিশ বছর আগে হাজ্জ্ব করেছিলেন বাবার সাথে। তিনি জানালেন, তখন রওজায় কোন আড়াল ছিলনা। শুধু গ্রিলের ভিতরে মশারী দেয়া। আর এখন সেখানে তিন স্তরের দূরত্ব।আমরা যে বিভিন্ন দরজা পেরিয়ে এসেছি, আগে মসজিদটাই অতটুকু ছিল।তখন হাজ্জ্বে কষ্ট বেশি হলেও কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ ছিল।নারীদের কবর জিয়ারত বারণ বিধায় আড়াল একটু বেশি।

রওজা দেখে অনেকে সেদিকে সিজদাহ দিয়ে শিরক পর্যন্ত করে ফেলে। আবার অনেকে মোবাইল দিয়ে ছবি তোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে।ভলান্টিয়াররা এগুলোতে যথাসাধ্য বাধা দেন।

রওজার সামনে কিছুটা অংশকে নবীজী (স) বেহেশতের অংশ বলে উল্লেখ করেছেন যাকে রিয়াজুল জান্নাহ বা বেহেশতের বাগান বলা হয়।এখানে দু’রাকাআত সালাত আদায়ের ফযিলত অনেক।এস্থানে দু’আ কবুল হয়।আমি এখানে আল্লাহর কাছে হযরত ফাতিমা (র) এঁর মত একটা মেয়ে চেয়েছিলাম।পরের বছর জাইমাহ আমার কোলে আসে।

হাজ্জ্বের এহরামঃ

এতদিন মনে হয়নি কোন কাজে এসেছি।কিন্তু যখন মিনায় যাবার সময় হল, তখন মনে হল।৮ই জিলহজ্ব মিনায় যাবার নিয়ম।কিন্তু প্রচন্ড জ্যাম হয়্‌,বাস পাওয়া যায়না বিধায় আমাদের ৭ই জিলহজ্ব্ব ওখানে নিয়ে যাওয়া হল।বাস যখন এসে গেল্‌ আমি ভয় পাচ্ছিলাম খুব।কেন জানিনা।শুধু মনে হচ্ছিল,এত দূর থেকে কত বাধা পেরিয়ে এসেছি,কিন্তু যদি হাজ্জ্ব কবুল না হয়! অঝোরে কাঁদছিলাম আর
 কুরআন তিলাওয়াত করছিলাম।

হাজ্জ্বের এহরাম বেঁধে বাসে উঠলাম।মিনায় রাত্রিযাপন ও ৫ ওয়াক্ত সালাত আদায়(সুন্নত)করলাম। সে রাতেই বাসের জন্য তাবু ছেড়ে রাস্তায় গেলাম কিন্তুবাস না পেয়ে রাস্তায়ই অগত্যা রাত্রিযাপন,বাস পেলাম বেলা দশটার দিকে।

আরাফার ময়দান। কিয়ামতের পর এ স্থানেই হবে হাশরের মাঠ। এখানেই আমাদের বিচার হবে। ভাবতেই কেমন যেন লাগে। আল্লাহর অশেষ রহমত যে আমি সেই ভয়ংকর দিন আসার আগেই এস্থানে দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ পেয়েছি। এজায়গার আরও একটা বিশেষত্ব আছে।তাহল, এখানে আমাদের দেশের মাটি আছে!

এজায়গায় কোন গাছ জন্মাত না।সৌদি সরকার এস্থানে সবুজায়ন করতে চাইলেন। তখন বাংলাদেশের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্লেনে করে বাংলাদেশের মাটি ওই জায়গায় ফেলার ব্যাবস্থা করেন ও সেখানে এখন কেবল নিম গাছই জন্মায়। সৌদিয়ানরা এটাকে জিয়া গাছ বলে চেনে।

আরাফায় প্রচুর কোম্পানি খাবার ও পানি সরবরাহ করে। তাবু খাটানো আছে। আলহামদুলিল্লাহ কোনই সমস্যা হয়না। আসরের সময়টাই সবচেয়ে মূল্যবান। এসময়টাই আল্লাহর দরবারে বেশি করে ক্ষমা চাইতে হয় আর সবার জন্য দু’আ করতে হয়।

আমি নিজের থেকেও বেশি আমার মায়ের জন্যই দু’আ করেছিলাম।আমি মায়ের 
কুলাঙ্গার মেয়ে,এত অন্যায় তার সাথে করেছি যে বলার মত না।মাত্র তের বছর 
বয়সে যে মেয়ে তার বাবামাকে হারিয়েছে,জীবনের বিভিন্ন ঝড়ঝাপটায় “মা” বলে
 একটা দীর্ঘশ্বাস হয়ত সে ফেলেছে,কিন্তু আমি তার মেয়ে হয়েই ছিলাম সারাটা 
জীবন।মা হতে পারিনি।মাকে সেবা করা তো দূরের কথা,নিজের হাতে ভাতটা পর্যন্ত খেতাম না।এত এত কাজ করে মা এসে রেস্ট না নিয়ে আমাকে খাইয়ে দিত।যখন কোন প্রয়োজন পড়েছে,মা এসে হাজির।হাজ্জ্বেও এলাম মায়ের কাছেই বাচ্চাকে রেখে-এসব যখন ভাবছিলাম তখন এত অস্থির লাগছিল যে বলার মত না।আম্মুকে ফোন দিয়ে ভ্যা ভ্যা করে কাঁদতে লাগলাম।আম্মু তো ওপাস থেকে আমার কান্না শুনে চিন্তায় অস্থির! ‘আম্মু কি হয়েছে? কোন বিপদ হল না তো!’ আমি বললাম, ‘আম্মু তুমি মাফ করস তো!বল না আম্মু,তুমি মাফ না করলে তো হবেনা! আম্মু’- বলে আবার ভ্যা ভ্যা ভ্যা! এরপর কিছুটা শান্ত হয়ে আমি একমনে আমার আম্মুর জন্য,নিজের,ও সবার জন্য ক্ষমা চাইতে লাগলাম।

মায়েরা এমনই হয়। তাদের কাছে তাদের সন্তান সবসময়ই ভাল। আমি জানি এবং এখনও বিশ্বাস করি আমি যদি জাহান্নামে যাই, তো অন্যতম প্রধান কারণ হবে পিতামাতার সাথে খারাপ ব্যবহার।অথচ আমার বাবা মা এমনভাবে আমার প্রসংশা করতে থাকে যে মনে হয় আমার থেকে ভাল মেয়ে বুঝি আর হয়না! সবার বেলায়ই হয়ত এমন।পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর নিয়ামত হল মা।আর তাই বুঝি পৃথিবীর মায়াটাও বেশি!

আরাফার মাঠে ওকুফ করা শেষে মুজদালিফায় যাও্য়ার কথা।কিন্তু প্রচন্ড জ্যামে বয়স্করা অসুস্থ হয়ে পড়াতে আমাদের আমির বাস থেকে নামে কিছুদূর হেঁটে আরেকটা বাসে উঠলেন।এখানেই ঘটল বিপত্তি। মুজদালিফার পথ হারিয়ে ফেললাম। খুব খারাপ লেগেছিল।পরে অবশ্য শুনেছি,পুরোপুরি সুন্দর করে সবকিছু পাবার সৌভাগ্য খুব কম লোকেরই হয়। আমাদের কাফ্বেলার এক বয়স্ক লোক খুব 
সুন্দর একটা কথা বলেছিলেন,হয়ত আমরা সবাই কিছু না কিছু ভুল করে ফেলেছি যার 
জন্য দম দেয়া প্রয়োজন ছিল, (হাজ্জ্বের কোন একটা নিয়ম ভুল হলে বা ছুটে 
গেলে নির্দিষ্ট পরিমান টাকা দেয়াকে দম বলে)আল্লাহ এভাবে করিয়ে নিলেন।

একটা ব্যাপার বলা গুরুত্বপূর্ণ যে, ৯ই জিলহজ্ব ফজর থেকে ১৩ই জিলহজ্ব আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ নামাজের সালাম ফিরানোর পর তাকবীরে তাশরিক পড়া বাধ্যতামূলক।যারা হাজী নন তা্রাও পড়লে সওয়াব পাবেন।

মিনায় এরপরে আর থাকা হয়নি।মক্কার হোটেল থেকেই হেঁটে হেঁটে পাথর মারতে যেতাম।আবার ফিরে আসতাম।শেষ দিনে পাথর মারার পর স্কুলে বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার মত অনুভূতি হচ্ছিল।আমরা রেস্তোরায় খেয়েছিলাম আর সবাই বেশ মজা করে আড্ডা দিচ্ছিলাম।

ঈদ করলাম।আশ্চর্যের ব্যাপার,আত্মীয়স্বজন ছাড়া ঈদ,তবুও ভাল লাগল! এর কারণ হল, এখানে ঈদের আমেজটা টের পাওয়া যায়।আমাদের পহেলা বৈশাখের মত।খুব পরিস্কার আর সাজানো,সবাই রাস্তায় কুশল বিনিময় করছে,খাবারের দোকানে ভিড়,ঈদ তো এমনই হওয়া উচিত। আমাদের দেশেও হয়,তবে এখন নববর্ষটার উৎসবটা দেখলে মনে হয় এটাই প্রধান উৎসব।

আরও একটা কাজ বাকি, বিদায়ী তাওয়াফ। এটা করার পরই আমার মন ছুটে গেল। আল্লাহর ইচ্ছা ছিল আমি হাজ্জ্ব করি, তাই এপথে শয়তান বাধা দিয়ে সুবিধা করতে পারেনি। কিন্তু যেই হাজ্জ্ব সমাপ্ত হয়ে গেল, আমার রব আমাকে আবার সেই মায়ের ভূমিকায় ছেড়ে দিলেন!

উপসংহারঃ

প্রথম ফিরতি ফ্লাইটের যাত্রী ছিলাম আমরা। সবাই সবার সাথে কুশল বিনিময় করে কাবাকে শেষবারের মত দেখে বাসে উঠলাম।আমি বাদে সবারই মন খারাপ।দেশে যাওয়ার ব্যাপারে কারোরই আগ্রহ নেই, আল্লাহর ঘর ছেড়ে আসতে কারোরই মন চায়না। কিন্তু আমি আমার অর্কসোনার জন্য অস্থির হয়ে পড়েছিলাম।তাও বাসটা যখন ছেড়ে যাচ্ছিল, মন কেমন হু হু করে উঠল।আর কি হবে দেখা, হলেও কতদিন পর, কে জানে!

প্লেন যখন ল্যান্ড করছিল, সবাই মোবাইল দিয়ে কল করা শুরু করে দিল, আমিও। আম্মুকে প্রথম কল, নো নেটওয়ার্ক, দ্বিতীয় কল , এই তো!”আম্মুউউউ আমি চলে আসছি! অর্ক কি করে?!!” আমি যেমন আমার বাচ্চাকে নিয়ে উতলা, আমার আম্মু তেমনি তার বাচ্চাকে নিয়ে উতলা।সে আমার কথার উত্তর দিবে কি, আমাকে প্রশ্ন করেই যাচ্ছে!

বাইরে অর্কর চাচা দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছে।আমি ওকে দেখেই অর্কর কথা জিজ্ঞেস করতে লাগলাম। অর্ক প্রথম প্রথম আমাদের কথা বলেছিল দু একবার, এখন আর বলেনা। পুরোটা পথ অর্কর গল্প শুনে আসলাম।আর ভাবছি, ও হয়ত আমাদের ভুলে গেছে।

বাসায় ঢুকে এক দৌড়।আম্মু আমাকে জড়িয়ে ধরে আছে আর পাশে গেঞ্জি পাজামা পরা আমার অর্কটা পুট পুট করে তাকিয়ে আছে।আমি কোলে নিচ্ছি, অচেনাদের দেখে যেভাবে কেঁদে ওঠে, তেমন করল না।কিন্তু আগের মতও ছিলনা।একটা মাস, অনেক সময়।ও হয়ত আমাকে ছাড়া অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে।সবাই কথা বলছে আর ও আমাকে ওর খেলনা দেখাচ্ছে। আম্মু বলে, আসলে অনেকদিন দেখেনা তো, তাই একটু দূরে চলে গেছে। দুইদিন দেখলেই ঠিক হয়ে যাবে।

চাপা দীর্ঘশ্বাস! মায়ের মত করে সন্তানের লাগেনা। এই যে আম্মু আমাকে জড়িয়ে ধরে খালি আদর করছে, আর আমি অর্কর জন্য অস্থির হয়ে আছি। আম্মুরও তো মেয়েটা একমাস দূরে ছিল।নিজের সংসার ফেলে মেয়ের সংসার আগলে রাখা, এখন মেয়েটাকে দেখে তার কত গল্প!আর আমি অর্কর দিকে তাকিয়ে আনমনে শুনে যাচ্ছি।

নাহ, মায়ের অনুভুতি সন্তান বোঝেনা মায়ের মত করে।মনে আছে, আমার বিয়ের ক’দিন পর আমার আম্মু আমার নাম ধরে চিৎকার করতে করতে অজ্ঞান হয়ে বাসায় একা পড়েছিল। বোনরা স্কুলে। আর আমি এ ঘটনা শুনে স্বাভাবিকভাবে বলেছিলাম, “কেন, আমি তো ভাল আছি!” মা কি জিনিস, মা না হলে বোঝা যায়না।

অর্কর বাবা গোসল করে বাসার লুঙ্গি পড়ে জায়নামাজে দাঁড়াতেই অর্ক সেদিকে তাকিয়ে চিৎকার করে কান্না! সবাই অবাক, একমাত্র আমিই বুঝলাম ব্যাপারটা।আসলে ও তো ওর বাবাকে কখনও টাক মাথা আর আমাকে বোরকা পড়া অবস্থায় দেখেনি।ওর চেনা চেনা লাগছিল, কিন্তু ওর বাবাকে সেই চিরাচরিত দৃশ্যে দেখে ওর সমস্ত কিছু মনে পড়ে গিয়েছে!

ওর বাবা আগের মতই ওকে সাথে নিয়ে নামাজে দাড়াল। সে যে কি কষ্টের দৃশ্য! আমার ছোট্ট ছেলেটা কাঁদছে আর রুকুতে যাচ্ছে, সিজদাহ দিচ্ছে আর একবার আমার দিকে, একবার বাবার দিকে তাকাচ্ছে। আরও কাঁদছে।

আমিও কাঁদছি, কিন্তু আমাকে আম্মু ঠেলেঠুলে গোসল করতে পাঠালো-“আসছোই তো। এখন বাবার কাছে থাকুক, তুমি আগে ফ্রেশ হও।”

ফ্রেশ হয়ে এসে দেখি ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি ওর পাশে ঘুম ভাঙার অপেক্ষায়। ঘুম ভেঙে সে তাকাল।

সেই অর্ক! আমার দিকে মন খারাপ করে তাকিয়ে। বুকে কি কষ্ট! “এতদিন আমাকে ফেলে কোথায় ছিলে!”-তার চোখেমুখে কেমন কাতরতা! আস্তে করে আমার বুকে মুখ গুঁজে পড়ে থাকল। আমি ডাকছি, বাবা। ও একটু পর পর আমার মুখটা দেখে, আবার মাথাটা বুকের সাথে লাগিয়ে লেপ্টে শুয়ে থাকে।আমার বাচ্চাটা কখনও কষ্ট পেলে বলেনা। আমার মাঝে যে কি হচ্ছিল, তা কি করে বোঝাই!আমি হতাশ হয়েছিলাম।মায়ের মত করে সন্তান অনুভব করেনা। কিন্তু ওর যে কষ্টটা আমি দেখছি, তাতে মনে হচ্ছিল, ও না বুঝলেই হয়ত ভাল ছিল!

একটা দিন আমার গায়ের সাথে লেগে ছিল অর্ক। কখনও আমি, কখনও ওর বাবা। তার কষ্ট যেন কমেই না। আম্মুকে হাত ধরে দেখাচ্ছে, “দেখ নানু,এই যে আমার মা,এই যে আমার বাবা!” আম্মু বলল, “নানু। তোমার সাথে আমি শোবোনা আজকে?” ও হাত ঝাড়া দিয়ে বলে, “সরো !আমি মার সাথে ঘুমাব!”

রাতে আমার চাচাচাচি এসেছিলেন। তাঁরা আগের বছরই হাজ্জ্ব করেছিলেন। সেসব স্মৃতি নিয়ে বেশ গল্প হয়েছিল. সবাই ফোন করছিল, কথা বলছি, খাচ্ছি, আম্মুর আদর খাচ্ছি – ছেলেকে বুকে নিয়েই সব চলছে।

ফারিযার হাজ্জ্ব কাহিনী সমাপ্ত। অতঃপর সে সুখে শান্তিতে ছেলেকে নিয়ে বাস করিতে লাগিল।

আমরা সকলের দোয়াপ্রার্থী!

হাজ্জ্ব নিয়ে যা লিখেছি,তাতে অনিচ্ছাকৃত ত্রুটির জন্য আমার রব যেন আমাকে পাকড়াও না করেন,আমায় যেন ক্ষমা করেন।আমার নিয়্যত যেন পরিস্কার থাকে।আমীন


story, article

Continue Shopping Order Now