ঘুরে আসি শন পাপড়ির রাজ্যে

ঘুরে আসি শন পাপড়ির রাজ্যে

ঘুরে আসি শন পাপড়ির রাজ্যে

By In undefined On 4/7/2020

ছেলেবেলার ছোট ছোট শন পাপড়ির কথা মনে আছে? মুদি দোকানের বয়ামে থরে থরে সাজানো শন পাপড়ি। আকৃতিটা ছিল গোল গোল কয়েনের মত, তবে কয়েনের চাইতে অনেক অনেক গুন পুরু।


কখনো টিফিনের টাকা, কখনো রিকশা ভাড়া বাঁচিয়ে দোকান থেকে শন পাপড়ি কেনার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকতাম আমরা। দোকানদার মামা এক টুকরো খবরের কাগজে শনপাপড়ি সাজিয়ে দিতেন। দোকান থেকে বাড়ি ফেরার আগেই তা চলে যেত উদরের অতল গহ্বরে।

একদম মিহি সুতার মত, মুখে দিতেই গলে মিলিয়ে যাওয়া চমৎকার এ মিষ্টি বানানো ভীষণ ঝক্কির কাজ।

শনপাপড়ি কিন্তু কোনো স্বয়ংক্রিয় মেশিনে তৈরি হয় না। শনপাপড়ি তৈরি হয় হাতের স্পর্শে, মাত্র চারটি উপকরণে।

বিশ্বাস হচ্ছে না? না হওয়ারই কথা। মডেস্টবিডির পাঠকদের নিয়ে আজ ঘুরে আসব শনপাপড়ির রাজ্যে। সেই ছোট্টবেলার শনপাপড়ি কীভাবে তৈরি হয় তা-ই জানবো গল্পে গল্পে।

আগেই বলেছি কোনো স্বয়ংক্রিয় মেশিনে এ শনপাপড়ি তৈরি হয় না। তৈরি হয় ভীষণ দক্ষ হাতে। শনপাপড়ির কারিগর প্রধাণত দুইজন। কাঠের লাকড়ি দেয়া চুলায় প্রকান্ড এক কড়াই বসিয়ে এক কারিগর তাতে ডালডা ঢালেন। চুলার তাপে ডালডা গলে গেলে তাতে দেয়া হয় আটা। এবার দৃশ্যপটে আরেক কারিগরের আবির্ভাব। তিনি খুন্তি দিয়ে অনবরত ডালডা আটার মিশ্রণ নাড়তে থাকেন। একজন আটা ঢেলে যাচ্ছেন, আরেকজন খুন্তি দিয়ে নেড়ে যাচ্ছেন। আটা ডালডার মিশ্রণটা থকথকে হয়ে গেলে আপাতত এ যজ্ঞে বিরতি।

এবার কাজ হবে চিনি আর পানি নিয়ে। কড়াই ভর্তি চিনিতে সামান্য পানি দিয়ে চুলায় চড়িয়ে দেয়া হবে। এটা কারখানার ঘরে গ্যাসের চুলাতেই করা হয়। চিনি আর পানি দিয়ে ক্যারামেল হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা। এক পর্যায়ে শনপাপড়ির কারিগর কড়াইয়ের দুই হাতল ধরে এমনভাবে ঘুরাতে থাকবেন, যেন ক্যারামেল ছলকে গায়ের উপর পড়ে যাবে। কিন্তু তারা এমনই দক্ষ যে এত ঘূর্ণির পরও ক্যারামেল শেষমেষ কড়াইয়েই রয়ে যায়।

এরপর ক্যারামেলের কড়াই নিয়ে কারিগর চলে যাবেন সিমেন্ট দিয়ে উঁচু করা পাটাতনের মত জায়গায়। সেই পাটাতনে ঢেলে দেয়া হবে ক্যারামেল। ক্যারামেল মোটামুটি ঠান্ডা হলে হালকা স্বচ্ছ্ব একটা পর্দার মত হয়ে যাবে। এবার কারিগর এতে ভাঁজের পর ভাঁজ দিবেন। আটার ডো এর মত মথতে থাকবেন তো থাকবেনই!ওদিকে আরেক কারিগর বিশাল গোলাকার এক টিনের ট্রে চুলায় দিয়ে থকথকে সেই আটা ডালডার মিশ্রণ ঢেলে দিয়েছেন। এই গোলাকার ট্রেতেই এখন এক অসম্ভব কান্ড ঘটবে।

চিনির তৈরি ডো দিয়ে কারিগর ততক্ষণে বিশাল এক মোটা রিং বানিয়ে ফিরে এসেছেন আরেক কারিগরের কাছে। গোলাকার ট্রেতে থকথকে মিশ্রণে সেই রিংটা বসিয়ে কারিগরদের যৌথ কর্মযজ্ঞ শুরু।

দুই কারিগরের দুই হাতে থাকবে মোটা কাঠির মত দুইটা করে মোট চারটা খুন্তি। দুইজন বসে যাবেন চুলার দুই প্রান্তে। এবার চারটা খুন্তি দিয়ে উলটে পালটে ঘুরিয়ে সরিয়ে সমস্ত মিশ্রণ রিং এর গায়ে উঠিয়ে নেয়া হবে। দুই কারিগরের টানা হেঁচড়াতে চিনির রিং আটার মিশ্রণ মিলেমিশে কখন যে একাকার হয়ে যাবে তা টেরই পাওয়া যাবে না। এবার আর রিংটা কেবল চিনির নয়, বরং চিনি, আটার তৈরি এক বিশাল রিং।

এই বিশাল রিংটাকে চুলে বাঁধার রাবার ব্যান্ডের মত কল্পনা করে নিন। দু’জন বা তিন জন মিলে বিশাল সেই ব্যান্ডে প্যাঁচের পর প্যাঁচ দিয়ে যাচ্ছেন। এক এক প্রান্ত থেকে সর্বোচ্চ শক্তিতে টেনেই যাচ্ছেন।


এহেন অত্যাচারে ব্যান্ড সদৃশ সেই চিনি আটার মিশ্রণ চিকন মিহি সুতায় পরিণত হবে৷ এবার কারিগর টানাটানি ছেড়ে সুতা আলগা করা শুরু করবেন। দেখলে মনে হবে রূপ কথার ডাইনীবুড়ি শনের মত চুলের বিনুনি খুলে দিয়েছে।

এবার দুই কারিগরের কাজ শেষ। এ পর্যায়ে নারী শ্রমিকরা কাজ করেন সাধারণত। লম্বা লম্বা সুতার মত শন পাপড়ি আরেকটি ট্রে তে তুলে নিয়ে ছোট ছোট ছাঁচে পুরতে থাকেন। সেই ছাঁচে বসেই শন পাপড়ি সাহেব পরিণত হয় একদম সেই ছোট্টবেলার গোলগাল পরিচিত মুখে।



গল্পে গল্পে আমাদের ভ্রমণ এখানেই শেষ। এরপর যখনই খেতে যাবেন এই আজব মিষ্টান্ন, তখনই মনে মনে শনপাপড়ির রাজ্যে ঘুরে আসতে ভুলবেন না যেন!


এই লেখিকার আরও লেখা

শব্দে কথায় যত বিভ্রাট!




***এই সাইটের লেখার কপিরাইট মডেস্ট কালেকশন এর। লেখা আপনি অবশ্যই শেয়ার করতে পারেন, সেটা আমাদের সাইট থেকে লিংক শেয়ারের মাধ্যমে। কিন্তু কপি পেস্ট করে নিজের প্রোফাইল বা পেইজে দেয়ার অনুমতি আমরা দিচ্ছিনা। আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।



article

Continue Shopping Order Now