মাছের ডিম সমাচার

মাছের ডিম সমাচার

By In undefined On 4/7/2020

বাসায় মেহমান আসবে, ভিআইপি মেহমান যাকে বলে। আমেরিকা থেকে বারো ঘন্টা 
বাস জার্নি করে আসা বরের বন্ধু আর বন্ধু পরিবার। ট্রাম্পের দেশের 
বাসিন্দাদের আমি এমনিতেই সমীহ করে চলি। এদের মাঝে ট্রাম্পের পত্নী 
মেলানিয়ার প্রতি আমার অন্যরকম মায়া অনুভূত হয়, স্বামী প্রবর তার হাত ধরতে 
চাওয়ায় বেচারীর নিজের হাত ঝটকা দিয়ে সরিয়ে নেয়ার বহুল আলোচিত নাটুকে 
দৃশ্যগুলো চোখের সামনে একের পর এক প্লে হতে থাকে। নাটকের প্রসঙ্গে মনে পড়ে 
গেলো, বছর দশেক আগে ‘শত্রুর সাথে বসবাস’ নামের এক হাস্যরসে ভরপুর 
‘আত্মজীবনী’ পড়েছিলাম সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন এরশাদের সাবেক স্ত্রী বিদিশা
 ইসলামের। ছাড়াছাড়ির পর তারা নাকি এখন বেশ ভালো বন্ধু। বাহ, বেশ! কিছু 
বিচ্ছেদ ফলপ্রসূ সত্য, আবার কিছু বিচ্ছেদ যন্ত্রণাদায়ক বটে।

যেমন ধরা যাক, মাছের সাথে মাছের ডিমের বিচ্ছেদ আমি মেনেই নিতে পারি না। 
সেদিন ভিআইপি মেহমানের সম্মানার্থে গেলাম বিশাল বাজারের লিস্ট নিয়ে এক 
হালাল সুপারস্টোরে। মাছের ডিপার্টমেন্টে গেলে আমি কেমন যেন বিদিশা, মানে 
বেদিশা হয়ে যাই। মন চায় সব মাছ কিনে ফেলি। দেশে থাকতে ভোর বেলা 
প্যাঁচপ্যাঁচে কাঁদা মাড়িয়ে তাজা মাছের সন্ধানে ব্যাজার মুখো বরকে নিয়ে 
খালপাড় নামের এক স্থানে প্রায়শ হানা দিতাম।মাছ যে খুব একটা খেতে পারি, তা 
না। আমার ওই লাল কানকোওয়ালা আর আধ ফুট লম্ফ দেয়া মাছ কেনাতেই সুখ।

নিন্দুকে বলে, ডিমওয়ালা মাছে স্বাদ নেই। আমার ধারণা অবশ্য সম্পূর্ণ 
উল্টো। ডিমওয়ালা মাছ মানে কাপড় কাচা গুড়ো সাবানের সাথে এই ধরেন, লাল নীল 
রঙের আর এফ এলের বালতি ফ্রি। সে যে কি এক আত্মতুষ্টি, বলে বুঝানো ভার। 
ডিমওয়ালা মাছ মানে টমেটো আর আলু দিয়ে ঝাল ঝাল ভুনা। তো, বরফে শায়িত পেট 
মোটা সি-ব্যাস মাছ দেখছি আর ভাবছি, পেটে ডিম নাকি আমার মতন সযত্নে লালিত 
সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ। খানিক নেড়েচেড়ে দুটো মাছ পরিষ্কার করে দিতে বললাম। 
বুড়ো মতন চাইনিজ ভদ্রলোক আমার দিকে পিছন ফিরে মাছের আঁশ ছাড়িয়ে, পেটের ময়লা
 বের করে বেশ প্যাকেটে বেঁধে দিলেন অল্প সময়ে। ঠারে ঠারে দেখছি মাছের পেট 
থেকে বের করা বিশাল হলুদ কমলা ডিম পাশে সরিয়ে রেখেছে। মাছের ডিম বলে কথা, 
লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ইয়ে, ওগুলো কি? ময়লা নাকি ডিম?’ 
চাইনিজ ভদ্রলোক দ্বিগুণ লজ্জা পেয়ে দ্রুত মাথা নাড়তে নাড়তে ডিমগুলো 
প্যাকেটে ভরে আমাকে দিতে দিতে বললেন, ‘ওকে! ওকে!’ কাহিনী বুঝলাম, আলদা 
বিক্রি করার ফন্দি এঁটেছিনু মনে।

এই প্লাস মাইনাস ঠকানোর খেলা কিন্তু সব জায়গাতেই কম বেশী চলে। 
মূল্যহ্রাসে চেরী কিনলে দেখি নিচেরগুলো থেঁতলানো, বা হালাল দোকান থেকে 
মুরগী কেনার সময় গিলা কলিজা বেমালুম ভ্যানিশ। ভাবটা যেন, মুরগীটা এতদিন 
কলিজাবিহীন দিব্যি বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। দেশে থাকতে একবার বাবা, 
অর্থাৎ আমার শ্বশুর একসাথে ১০-১২টা মুরগী কিনে এনেছেন। এক প্যাকেটের মুরগী 
খোলার পর দেখা গেল বেচারা পঙ্গু ছিল। এক রান নাই। এক ঠ্যাঙে সে কিভাবে 
লাফিয়ে লাফিয়ে মানবেতর জীবন পার করেছে ভেবে উদাস হয়ে গেলাম যারপরনাই।

কিছুদিন আগে হেঁটে হেঁটে বাসায় ফিরছি সপরিবারে এক কাছের দাওয়াত থেকে, 
আকস্মিক হাসির ফোয়ারা ছুটিয়ে কিছু কিশোর কিশোরী পাশ কাটিয়ে চলে গেল। তাদের 
আলাপের বিষয়বস্তু শপ লিফটিং। তারা কোন এক দোকান থেকে টুকটাক হাত সাফাই 
করেছে, দোকানীরা টের পায়নি। ক্লোয সার্কিট ক্যামেরাতে ধরা পড়েছে কিনা তা 
নিয়ে তারা হালকা উদ্বিগ্ন। ছোট বেলায় মধ্য প্রাচ্যে থাকতেও বেশ কয়েকবার এমন
 ঘটনা দেখেছি। সবাই ভাবে, একটু সরালে খুব বেশী যায় আসবে না। কথা হয়ত সত্যি,
 কিন্তু দিন শেষে মাছ থেকে ডিম সরিয়ে ফেলা মানুষেরা কি খুব তৃপ্তির ঘুম 
দিতে পারে? মাছের সাথে ডিমের বিচ্ছেদ মেনে নেয়া যায় তবুও, কিন্তু বিবেকের 
সাথে মনের বিচ্ছেদের চেয়ে পীড়াদায়ক আর কিছু আছে বলে জানা নেই।

ভাবুক

এডিটর’স ডেস্ক, মডেস্টবিডি




Continue Shopping Order Now