ডিপ্রেশন –এক নীরব ঘাতক

মানব শরীর মানে শুধু রক্ত মাংসের এই কাঠামো ছাড়াও আরেকটা প্রধান ভাগ হলো আমাদের মন কিংবা বলা যায় মানসিক স্বাস্থ্য। আমরা শারীরিক রোগ নিয়ে যেমন খুব উৎকণ্ঠিত হয়ে যাই, ডাক্তার-ঔষধ-হাসপাতাল ছোটাছুটি করে বেড়াই; ঠিক বিপরীত কাজ করি মানসিক রোগের বেলায়। মনসিক রোগ থার্মোমিটার কিংবা প্রেশার মেশিন দিয়ে মাপা গেলে বোধহয় একে আমরা গুরুত্ব দিতাম। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আপনি সচেতন হওয়া মানেই আপনাকে শুনতে হবে হয় আপনি “পাগল” নয়তো এইসব “বড়লোকি ঘোড়ারোগ”। আর ইসলামিক জ্ঞান সম্পন্ন অনেকেই এটাকে শুধুই জিনের প্রভাব বলেই পার করে দিতে চায়। কিন্তু আমরা কি জানি, এখন পৃথিবীর প্রতি চার জনের মধ্যে একজন জীবনের কোন না কোন পর্যায়ে মানসিক রোগে ভুগে থাকে।

মানসিক রোগ অনেক ধরনের আছে যার মধ্যে ডিপ্রেশন অন্যতম। এই ইংরেজি ডিপ্রেশন শব্দটার বাংলা অর্থ হলো বিষন্নতা; কিন্তু কেন যেন আমার কাছে বিষন্নতা শব্দটা এই রোগের ব্যাপকতার তুলনায় অনেক ছোট মনে হয়। তাই আমি ডিপ্রেশন শব্দটাই ব্যবহার করতে ইচ্ছুক। ডিপ্রেশনে থাকা এই মানুষগুলো নিজের ভেতরে এক সমুদ্র শূন্যতা চেপে রেখে আপনার আমার চারপাশে ঘুরে বেড়ায় । তাঁরা প্রতিনিয়ত স্বাভাবিক সুন্দর জীবনের অভিনয় করে যায়। কিন্তু এই সুন্দর বর্নিল পৃথিবীতে থেকেও তাঁদের পৃথিবী ধূসর, বর্ণহীন। নিজেকে নিজে প্রবোধ দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে একসময় তাঁরা ভেঙ্গে পড়ে; কেউ কেউ আবার চিরতরে হারিয়ে যায়। ডিপ্রেশন কোন রোগ না; এইসব নিয়ে কথা বলা যাবেনা – এই প্রচলিত ট্যাবু থেকে এখন বের হওয়া সময়ের দাবী। Institute for Health Metrics and Evaluation (IHME) এর Global Burden of Disease Study 2016 থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী প্রায় ২৬৮ মিলিয়ন মানুষ ২০১৬ সালে ডিপ্রেশনে ভুগেছে [১]। এই 

স্টাডির তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ৪.৪৪% লোক ডিপ্রেশনে আক্রান্ত; যার মধ্যে পুরুষের তুলনায় মহিলার সংখ্যা ২% বেশী। কিন্তু আমার কাছে মনে হয় এই সংখ্যা আরও অনেক বেশী। কারণ এই সামাজিক ট্যাবুর জন্য আমরা অনেকেই এই জিনিস নিয়ে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করিনা।

ডিপ্রেশন আবার কয়েক ধরনের আছে [২]। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোঃ


১) Major Depressive Disorder (MDD)- একে আবার ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশনও বলা হয়। এই ডিপ্রেশনে পাঁচটা প্রধান লক্ষণ হলো বিষন্নতা, শূন্যতা, ব্যর্থতা, অকর্মণ্যতা, এবং অপরাধবোধ। এইগুলো যদি নূন্যতম দুই সপ্তাহের বেশী থাকে তাহলে সে MDD তে আক্রান্ত বলে ধরা হয়। এই ডিপ্রেশনে আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে যে উপসর্গ দেখা যায় তা হলো ক্ষুধামন্দা, ওজন কমে যাওয়া, ঘুম না হওয়া, কোন কাজে এনার্জি না পাওয়া ইত্যাদি। এই উপসর্গ প্রকট আকার ধারন করলে মানুষ আত্মহত্যার চেষ্টাও শুরু করে। এই ক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শ অবশ্যই নেওয়া প্রয়োজন।


২) Persistent depressive disorder – এর আগের নাম ছিলো “Dysthymia”. এই ডিপ্রেশনে আক্রান্ত তাঁকেই ধরা হয় যার মধ্যে “লো মুড” অনুভূতি কমপক্ষে দুই বছর ধরে বিদ্যমান থাকে এবং তা মেজর ডিপ্রেশনে পরিণত হয়না। এই ডিপ্রশনে আক্রান্ত ব্যক্তি নরমাল জীবন যাপন করতে পারলেও তাঁর মধ্যে একটা নিরানন্দ অনুভূতি কাজ করে। এর সাথে অন্য উপসর্গ যা দেখা দিতে পারে তা হলো খাওয়া ও ঘুমের পরিবর্তন, হতাশা।


৩) Bipolar Disorder –এর অপর নাম হলো “Manic Depressive Disease”. Bipolar Disorder হলো আবেগজনিত মানসিক রোগ। এই রোগ ডিপ্রেশন ও আবেগ উদ্দীপনার এক যুগলবন্দী বলেই একে বলা বাইপোলার ডিসঅর্ডার বলে। একদিকে যেমন বিষন্নতায় কোন কিছু ভালো লাগেনা। অন্যদিকে তখন অস্বাভাবিক উত্তেজনা ও এনার্জি অনুভূত হয়। এর উপসর্গ গুলো হলোঃ বিশাল কল্পনা, অস্বাভাবিক আত্মমর্যাদাবোধ, ঘুমের স্বল্পতা, ক্ষুধা ও জৈবিক কাজে আগ্রহ কমে বা বেড়ে যাওয়া, অতিরিক্ত কর্ম তৎপরতা, অতিরিক্ত আনন্দ অনুভূত হওয়া ইত্যাদি। এসব কোন অনুভূতি বেশী সময় থাকেনা যা আবার কখনও আত্মহত্যার দিকে ধাবিত করে।৪) Seasonal affective disorder (SAD) – এই ডিপ্রেশন সাধারণত দেখা দেয় শীতকালে বিশেষভাবে বলতে গেলে শীতপ্রধান দেশে এই ডিপ্রেশন বেশী দেখা যায়। সাধারণত শীতকালে দিন ছোট হয়ে যাওয়া ও সূর্যের আলো কম পাওয়া থেকেই এই ডিপ্রেশন তৈরি হয়। আর শীতে শেষে বসন্ত আসলে সাধারণত চলে যায়। তবে এই ডিপ্রেশনও যদি প্রকট আকার ধারণ করে তবে অবশ্যই ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করা উচিত। 


৪) Seasonal affective disorder (SAD) – এই ডিপ্রেশন সাধারণত দেখা দেয় শীতকালে বিশেষভাবে বলতে গেলে শীতপ্রধান দেশে এই ডিপ্রেশন বেশী দেখা যায়। সাধারণত শীতকালে দিন ছোট হয়ে যাওয়া ও সূর্যের আলো কম পাওয়া থেকেই এই ডিপ্রেশন তৈরি হয়। আর শীতে শেষে বসন্ত আসলে সাধারণত চলে যায়। তবে এই ডিপ্রেশনও যদি প্রকট আকার ধারণ করে তবে অবশ্যই ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করা উচিত।


এছাড়াও আরও দুইটা প্রধান ডিপ্রেশন যা মেয়েদের মধ্যে দেখা যায় তা হলোঃ


১) Peripartum or Postpartum Depression – মেয়েদের ক্ষেত্রে  প্রেগন্যান্সি থেকে শুরু করে বাচ্চা জন্মের এক বা দুই বছরের মধ্যে এই ডিপ্রেশন দেখা দিতে পারে। অনেকেই একে বেবি ব্লুর সাথে এক করে ফেলে। কিন্তু বেবি ব্লু আর Postpartum Depression দুইটা ভিন্ন জিনিস। প্রতি সাত জনের মধ্যে একজন Postpartum Depression এ ভুগে। এই ডিপ্রশনে আক্রান্ত মার সাথে 

আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাচ্চা এবং পুরা পরিবার। এই ডিপ্রেশনের ট্রিটমেন্টের ক্ষেত্রে ডাক্তারের পাশাপাশি পরিবারের একটা উল্লেখযোগ্য ভুমিকা হয়েছে।


২) Premenstrual Dysphoric Disorder (PMDD) – সাধারণত এই ডিপ্রেশন ওভুলেশানের পর থেকে menstrual period পর্যন্ত থাকে। এর উপসর্গ হলো তিরিক্ষি মেজাজ, অবসাদ, বিরক্তভাব, food cravings ইত্যাদি। এই ডিপ্রেশন যদি মাত্রাতিরিক্ত আকার ধারণ করলে হরমোনাল ট্রিটমেন্টের প্রয়োজন হয়।


আসুন আমরা ডিপ্রেশন নিয়ে জানি এবং আমাদের আশেপাশে থাকা মানুষগুলোকে সাহায্য করি এর থেকে মুক্তির জন্য।

,


তথ্যসূত্রঃ



১) https://ourworldindata.org/mental-health



২) https://www.health.harvard.edu/mind-and-mood/six-common-depression-types



Continue Shopping Order Now